শিক্ষার আলো : রঞ্জন সাহা

0
1378
  1. ক্লাসে ঢুকেই বাংলা স্যার নুরীকে ডেকে একটি গান গাইতে বলে, নুরী বেশ চটপটে আর একটু বেশী কথা বলে। নুরী এলো স্যারের কাছে। স্যার মাথায় হাত বুলিয়ে গাইতে বললেন। নুরী গান করার আগে জানতে চাইলো কোন গানটা গাইবে। ক্লাসের সবাই বলে ওঠে, আয়রে মেয়ে ছেলের দল গানটা গাও নুরী। নুরী ফিক করে একটু হেসে, গানটা ধরে, আয়রে মেয়ে ছেলের দল স্কুলেতে পড়তে চল লেখাপড়া শিখতে পারলে বাড়বে শিশুর মনোবল ।
    ক্লাশের সুজন একটু বাচাল টইপের। সে দাঁড়িয়ে বাংলা স্যারকে জিজ্ঞেস করলো, স্যার আমরা এতদিন পড়েছি আয় ছেলেরা আয় মেয়েরা আগে ছেলে। আর নুরী গাইলো আয়রে মেয়ে ছেলের দল। সেদিনের মত নুরীর গান গাওয়া আর হলো না। স্যার সুজনকে উদ্দেশ্য করে বলে, সুজন এই গানটি আগে শুননি? সুজন বলে, শুনেছি স্যার, কিন্তু এতদিন বলিনি, ভয়ে। বাংলা স্যার হেসে উঠলেন ধন্যবাদ সুজন। তোমার সাহস আছে আর সাহসীরাই উপরে উঠবে। ভয়কে জয় করতে হবে। বাংলা স্যার একটু নড়েচড়ে বসলেন। ক্লাশের পড়া শেষ করেই অন্য প্রসঙ্গে গেলেন। ক্লাশের ছাত্ররা খুব খুশী। স্যার গল্প করবেন, সোনামনিদের সাথে। ক্লাশে হৈ চৈ পড়ে যায়। ক্লাশের পরেই টিফিন। স্যার সেদিকেও খেয়াল করলেন। তারপর স্যার ছাত্রদের উদ্দেশ্যে বললেন, শোন, তোমরা আজ বাড়ি গিয়ে তোমাদের মা বাবাকে জিজ্ঞেস করবে তাদের ছোটবেলার কথা, তারা যখন তোমাদের মত ছিল, স্কুলে কি পড়তেন, স্কুলের নাম বলতে পারে কিনা, কে কোন ক্লাশ পর্যন্ত পড়েছে? স্কুলে তারা ঝগড়া করেছে কিনা। স্যাররা কি শাস্তি দিতেন। কান পেতে স্যারের কথা গুলো শোনে কেউ কেউ আবা কেউ স্যারের কথা ভাল করে শুনতেই পায়নি। তুবও সবাই সিদ্ধান্ত নেয় বাবা মাকে জিজ্ঞেস করবে তাদের ছোটবেলার কথা। দেখা গেল অনেকের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে যায়। বাংলা স্যার বুঝতে পারেন অনেকের মা বাবা লেখা পড়া জানেন না তিনি বলেন, লেখাপড়া না জানা কোন অপরাধ নয়। তারা সুযোগ পায়নি তাই তারা পড়তে পারেনি। কারণ আগের মত এত স্কুল ছিল না এখানে, সেখানে। তাই তোমরা লেখাপড়া শিখে শিক্ষার প্রসার ঘটাবে। ততখনে টিফিনের ঘন্টা পড়ে যায়। বাংলা স্যার আগামী কালের কথা আরেক বার স্মরণ করে দেয় সবাইকে। ধন্যবাদ জানিয়ে বেড়িয়ে যান স্যার পরের দিন যথা সময়ে বাংলা স্যার ক্লাশে ঢুকলেন। অনেকে আজ অনুপস্থিত দেখা গেল। স্যার আগে খোঁজ খবর নিলেন সবাই বাবা মায়ের সাথে কথা বলছে কি না? কারো বাবা বাড়ি ছিল না কেউ বা সাহস করে জিজ্ঞেস করতেই পারেনি। বাংলা স্যার সেদিনের পাঠ শেষ করেই একে একে শান্তা, ছালবিনা, খুশী, সিরাজ, মেহেদী, পারভেজ, আকাশ, বৃষ্টিকে জিজ্ঞেস করে। সুজনকে জিজ্ঞেস করতেই সে এক বিরাট কাহিনী। সুজন দাঁড়িয়েই কেঁদে ফেলে। স্যার তো অবাক। ক্লাশের সবাই সুজনের কান্না দেখে অনেকেই এমনিতেই কেঁদে ফেলে। বাংলা স্যার সুজনকে কাছে ডেকে আদর করে কান্না থামান। অন্যদেও স্যার বললেন, তোমরা যে বাঙ্গালী তা তোমাদের দেখে যে কান্না হয় তা দেখেই বুঝলাম। স্যারের কথা শুনে সবাই চুপচাপ হয়ে যায়। শোন, সুজনের কান্নার কারণ টা আগে জেনে নিই। সুজনকে আরো কাছে টেনে নেয় স্যার। তারপর বলতে বলে কান্নার কারণটা কি? ক্লাশের সবাই আগ্রহ নিয়ে বসে আছে সুজনের কথা শোনার জন্য। স্যার সুজনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন, এবং সাহস নিয়ে বলার জন্য বললেন। সুজনের দুঃখ তার বাবা লেখা পড়া জানে না স্যার সুজনকে শান্তনা দেয়, দেখ সুজন শুধু তোমার বাবা নয় এ দেশের লক্ষ লক্ষ বাবা মা লেখাপড়া জানে না। তাতে কি হয়েছে তুমি লেখাপড়া শিখে তোমার মা বাবার স্বপ্ন পুরন করবে। সে কারনেই হয়তো তুমি আজ পঞ্চম শ্রেণীতে ভাল রেজাল্ট করেছো। আমি আশির্বাদ করি তুমি লেখাপড়া শিখে তোমার গ্রামের মুখ উজ্জল করবে। এখন বলতো সুজন তোমার বাবা লেখাপড়া করতে পারেনি কেন? সুজন এতক্ষনে তার আবেগকে বেগে পরিনত করেছে। সুজন বললো তার বাবা লেখাপড়া না করার কারণ। সুজন বলতে থাকে, জানেন স্যার আমার বাবা ও কাঞ্চনপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিল একটু বেশী বয়সে। স্কুলে খেলার সময় আমার বাবা পায়ে লেগে একজনের পায়ে ব্যাথা পায়। ঐ স্কুলের স্যারের কাছে নালিশ দেয় ঐ ছেলে। স্কুলের স্যার আমার বাবাকে ৩০ টাকা জরিমানা করে। ঐ ত্রিশ টাকা জোগাড় করা ছিল এক অসাধ্য ব্যাপার। টাকা জোগাড় করতে না পেড়ে আর আমার বাবা স্কুলে যেতে পারেনি। বেশ কিছুদিন পড় কামলা দেওয়া শুরু করে। আর এজন্য আমার বাবা লেখাপড়া করতে পারেনি স্যার। বাংলা স্যার সুজনের কাছ থেকে ওর বাবার গল্প শুনতে শুনতে বলে যান সেই কাঞ্চনপুর স্কুলে। আর ভাবে বেত্রাঘাত, অবজ্ঞা, জরিমানার কারণেই হয়তো অনেকের ভাগ্যে লেখাপড়া হয়নি। যেমন সুজনের বাবা। এক মিনিট ভাবেন বাংলা স্যার। তিনি ভাবেন এই ডিজিট্যাল যুগেও কি এমন হচ্ছে? বাংলা স্যার সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলে, শোন তোমরা আল্লাহ’র পরেই যাকে বেশি সম্মান করতে হয় তিনি হলেন মা এবং বাবা। মা বাবা কোন দিন অশিক্ষিত হয় না। যদি অশিক্ষিত হতো তাহলে অনেকে অশিক্ষিত লোকের ছেলে মেয়েরা বি.এ, এম.এ পাশ করতো না। এখন তোমরাই পারো তোমাদের জীবনকে সুন্দরভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে শুধু লেখাপড়ার মাধ্যমে। তুমি লেখাপড়া করলেই তোমাদের বাড়ীর অন্ধকার দূর হয়ে আলোর রেখা ফুটে উঠবে। ততক্ষণে টিফিনের ঘন্টা পড়ে গেছে।

একটি রিপ্লাই দিন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.