অসুস্থ মায়ের পরিবারের দায়িত্ব নিলেন কুড়িগ্র্রামের ডিসি

0
1792
বুধবার সকাল দশটার দিকে কলাবাগানে ফরিদাদের সংসার দেখতে যান জেলা প্রশাসক

নিজস্ব প্রতিবেদক, কচিপাতা

সম্প্রতি ফুটপাতে শুয়ে থাকা অসুস্থ এক মায়ের মাথায় দুটি শিশুর পানি ঢালার ছবি তোলে ভার্সিটি পড়ুয়া ছাত্র পারভেজ পেশায় একজন অনলাইন ফ্রিল্যান্সার। ফেসবুকে পোস্ট করলে মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়। পারভেজ ও তার কয়েকজন বন্ধুসহ ফরিদাকে হাসপাতালে নিয়ে যান। ফরিদার পরিবারের করুণ দশার কথা আলোচিত হয়েছে এক ভিডিও চিত্রের কারণে। রাস্তার পাশে অসুস্থ হয়ে পড়ে থাকা ফরিদার মাথায় পানি ঢালছিল তার ১১ বছরের মেয়ে আকলিমা। পাশে পাঁচ বছর বয়সী ছেলে ফরিদুল। অপুষ্টি আর খাদ্যাভাবে শিশুগুলো বাড়েনি বয়স অনুপাতে। আকলিমার কাছে মায়ের অবস্থা জানতে আকলিমা জানায়, ওষুধ কিনার টাকা নেই। দায়িত্ব নেন পারভেজ হাসান। এরপর চিকিৎসার জন্য ফরিদাকে নেয়া হয় গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালে। সেখানে চিকিৎসায় সুস্থ হন তিনি।এই অসুস্থ মায়ের পরিবারের দায়িত্ব নিলেন কুড়িগ্র্রামের ডিসি।

কুড়িগ্রাম থেকে ঢাকায় আসা ফরিদা বেগম ও তার তিন সন্তান সহ অসুস্থ স্বামীকে নিয়ে ফুটপাতে নিদারুণ কষ্টে জীবন-যাপন করছিল। তাদের দূরাবস্থার চিত্র ইতিমধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এমন অবস্থায় নিঃস্ব ফরিদার পাশে দাঁড়ালেন কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক মোছা. সুলতানা পারভীন।অসহায় ফরিদার পরিবারকে কুড়িগ্রামে আবাসনের ব্যবস্থা করার পাশাপাশি পরিবারের উপার্জনের ব্যবস্থা এবং সন্তানদের পড়ালেখার ব্যবস্থা করার কথা জানান জেলা প্রশাসক মোছা. সুলতানা পারভীন।

কুড়িগ্রামে ফিরে যেতে আগ্রহ প্রকাশ করায় বৃহস্পতিবার পরিবারসহ ফরিদাদেও সেখানে যাওয়ার ব্যবস্থাও ইতিমধ্যে করেছেন তিনি। ফরিদার বাড়ি কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার ইসলামপুর গ্রামে। রাজধানীর কলাবাগান ওভারব্রিজের নিচে একটি খুপড়ি ঘর তাদের আশ্রয়স্থল। ফরিদার স্বামী আনসার আলী হৃদরোগে আক্রান্ত। তিন সন্তানের মধ্যে এক মেয়েও প্রতিবন্ধী।

এদিকে এই খবর অনলাইন নিউজ পোর্টাল বিভিন্ন গণমাধ্যমে গুরুত্বের সাথে প্রকাশিত হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও এই খবর আলোচিত হয়।

কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক মোছা. সুলতানা পারভীন পরিবারটির সঙ্গে দেখা করতে যান

গণমাধ্যমের খবর এবং ফেসবুক থেকে এমন অবস্থার কথা জানতে পেরে দাপ্তরিক কাজে ঢাকায় আশা কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক মোছা. সুলতানা পারভীন পরিবারটির সঙ্গে দেখা করতে যান। আগে কথা বলেন পারভেজ হাসানের সঙ্গেও। বুধবার সকাল দশটার দিকে কলাবাগানে ফরিদাদের সংসার দেখতে যান জেলা প্রশাসক। তাদের সঙ্গে কথা বলেন। মানবতার দিক থেকে তিনি নিজে এবং সরকারিভাবে সবধরনের ব্যবস্থা করার আশ্বাস দেন।

মোছা. সুলতানা পারভীন বলেন, ঢাকায় কাজে এসেছিলাম। কিন্তু আগেই ফেসবুকে এবং পত্রিকায় এদের নিয়ে খবর পড়লাম। কুড়িগ্রামের মানুষ তারা ঢাকায় ফুটপাতে এইভাবে জীবন যাপন করবে আর আমরা কিছু করবো না এটা হয় না। তাদের জন্য সবকিছুর ব্যবস্থা করা আমাদের দায়িত্ব। কোন মানুষ গৃহহারা থাকবে না- সরকারের এমন লক্ষ্যের কথা উল্লেখ করে সুলতানা পারভীন আরো বলেন, সেই লক্ষ্য বাস্তবায়ন করাই আমাদের কাজ।

ডিসি বলেন, এই পরিবারের সবধরনের দায়িত্ব আমি জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়েছি। তাদের জন্য ঘরের ব্যবস্থা করব। উর্পাজনের জন্য যেটা তাদের সুবিধা হয় সেটা করব। প্রয়োজনে দোকান কওে দেব। ছেলেমেয়েদেও লেখাপড়ার ব্যবস্থা কওে দেব। তাকে এইভাবে কাছে পেয়ে ফরিদারা আবেগ আপ্লুুত হয়ে পড়েন বলে জানান জেলা প্রশাসক।

দুপুরে জেলা প্রশাসকসহ আরও কয়েকজন পরিবারটির সঙ্গে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন এমন একটি ছবি পোস্ট করেন সাংবাদিক ও লেখক সাইফুল ইসলাম জুয়েল।

জুয়েল বলেন, আলহামদুলিল্লাহ অবশেষে সেই মা তার সন্তানদের একটা স্থায়ী গতি হলো। গতকালই জেনেছিলাম, কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক মহোদয় তাদের দায়িত্ব নিচ্ছেন। ঢাকাস্থ পুলিশের দু’জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাও তাদের জন্য স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা কওে দেয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন। আজ কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক তাদের দায়িত্ব বুঝে নেন।
কুড়িগ্রামের এই পরিবারটি নদীভাঙনে সব হারিয়ে ঢাকায় এসে একটি ফুটওভার ব্রিজের নিচে বসবাস শুরু করে। এখন তারা আবার আপন গন্তব্যে ফিরে যাবার কথা শুনে খুব ভালো লাগছে।

 

পারভেজ হাসান বলেন, ঢাকাস্থ কুড়িগ্রাম সমিতির মাধ্যমে জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীন আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। বিস্তারিত জানতে চান। জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে তিনি এই পরিবারটির সামগ্রিক ভার নেয়ার কথা নিশ্চিত করেন। পরিবারটির জন্য বাসস্থান, ফরিদা বেগমের স্বামী আনসার আলীর জন্য চাষের জমি ও চাষের জন্য যা লাগে তা কৃষি অফিস থেকে দেয়া হবে।

মায়ের নাম ফরিদা। বয়স ৩০ এর কোঠা ছুঁই ছুঁই। স্বামী আনসার আলী দীর্ঘদিন ধরে ভুগছেন হার্টেও রোগে। বছর সাত হল জীবিকার সন্ধানে কুড়িগ্রাম থেকে ঢাকায় আসে পরিবারটি। তাদের ভাসমান জীবন-যাপনে কখনো ফুল বিক্রি করে আবার কখনো ফুলের মালা বিক্রি করে, এভাবেই চলে তাদের চার জনের সংসার। ছোট শিশু দুটোও মায়ের কাজে সহায়তায় কখনো ফুল কখনো বা চকলেট বিক্রি করে।
আগামীকাল বৃহস্পতিবার (১২ জুলাই) রাতে ফরিদা ও তার পরিবার বাসে করে কুড়িগ্রামের উদ্দেশে রওনা হবেন। বাড়ি পৌঁছানোর দায়িত্বে আছে ঢাকার কুড়িগ্রাম সমিতি।

মানবতার আরও একবার জয় হয়েছে। মানবিকতার চরম দৃষ্টান্ত এই নিদর্শন হয়ে থাকা এই ঘটনাটি দেশের প্রতিটি তরুণের দায়িত্ব বলে মনে করেন।

একটি রিপ্লাই দিন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.