আমার স্বপ্নপূরণ- শাহ্ নাজ পারভীন

0
518
শাহ্ নাজ পারভীন

জীবন একটা যুদ্ধক্ষেত্র, এখানে প্রতিনিয়ত নানা প্রতিকূলতার সাথে লড়াই করে টিকে থাকতে হয়, আর এরই মাঝে কিছু সুপ্ত বাসনা বা স্বপ্ন লালন করে যাই একান্ত সংগোপনে মনের গহীনে। প্রতিটি মানুষই স্বপ্ন দেখে এবং স্বপ্নের মাঝেই বাঁচে। সব স্বপ্ন হয়তো সবার পূরণ হয় না তবুও এই স্বপ্ন পূরণে মানুষ মরিয়া হয়ে উঠে, স্বযত্নে লালন করে বুকের মধ্যে। তেমনই একটি স্বপ্ন পূরণের গল্প বলবো আজ আপনাদের আমার জীবনের স্বপ্ন পূরণের গল্প।

আমি শাহ্ নাজ পারভীন, একজন গৃহিণী। খুব ছোটবেলায় আমার যখন মাত্র দুবছর বয়স তখন বাবাকে হারাই। সংসারে যতটা না অভাব ছিল তার চেয়ে বেশি অভাব ছিল অভিভাবকহীন সংসারে নিরাপত্তার। তাই খুব ছোট বয়সেই আমার বিয়ে দিয়ে দেয়া হয়। না, আমার মতের অমতে নয় বরং বিয়ের প্রস্তাব আসাতে আমি খুব খুশি ছিলাম এই ভেবে যে আমাকে আর পড়তে হবে না, আমার পড়াশোনায় কোন কালেই তেমন কোন আগ্রহ ছিল না, তার চেয়ে অনেক বেশি সাংস্কৃতিক যে কোন বিষয়ে আগ্রহ ছিল। ছবি আঁকা, গান, নাচ, অভিনয় আর আবৃত্তি আমাকে খুব টানতো। কিন্তু কোন কিছুই যথাযথভাবে শেখার সুযোগ পাইনি। বিয়েটাই আমার কাছে মুক্তি মনে হয়েছিল। তবে আমাদের পরিবার থেকে বলা হয়েছিল আমাকে যেন পড়ালেখার সুযোগ দেয়া হয়। আমার স্বামীর পরিবার এই ক্ষেত্রে কোন আপত্তি করেনি বরং এতে তাদের সম্মতি জানিয়েছিল।

আমি শ্বশুরবাড়িতে পা দেয়ার আগেই বুঝতে পেরেছিলাম আমার লেখাপড়া করাটা কতটা জরুরি। এরই মধ্যে আমার প্রথম সন্তান আমার গর্ভে আসে। আমি এই অবস্থাতেও আমার মায়ের অনুপ্রেরণায় লেখাপড়া চালিয়ে যেতে মনস্থির করি এবং একে একে মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক, স্নাতক ও মাস্টার্স ডিগ্রি কমপ্লিট করি সেই সাথে বাচ্চাদের ও সঠিকভাবে মানুষ করে তুলতে নিজের সুখ স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দেই। আমি উপলব্ধি করি শুধুমাত্র মেয়ে হয়ে জন্মগ্রহণ করার জন্য আমি জীবনে যে সকল সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছিলাম এবং আমার প্রতিভা বিকাশের স্বপ্নগুলোর অপমৃত্যু হয়েছিল তা আমার সন্তানদের ক্ষেত্রে কখনই আমি হতে দেবো না।

আজ আমি গর্ব করে বলতে পারি, আমার সন্তানরা সত্যি মানুষের মত মানুষ হতে চলেছে। ওরা একাডেমিক কোর্সে সর্বোচ্চ রেজাল্টের পাশাপাশি নানা ক্ষেত্রে ওদের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে চলেছে প্রতিনিয়ত। ওরা এখন স্ব স্ব ক্ষেত্রে অনেকটাই সফল। বড় সন্তান স্বনামধন্য স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটি থেকে কৃতিত্বের সাথে এম বি এ কমপ্লিট করার পর এখন একটা মাল্টিন্যাশনাল  কোম্পানির কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত। ছোট ছেলে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকে সর্বোচ্চ রেজাল্ট করে ফুল ফান্ড স্কলারশিপ নিয়ে সিউল ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে কম্পিউটার সায়েন্সে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে।

এতসব কিছুর পরও আমার একটা গোপন কষ্ট আমাকে প্রতিনিয়ত ক্ষতবিক্ষত করে যাচ্ছিল যা কিনা আমার একান্ত আত্মপরিচয়। আমার স্বামী আমাকে লেখা পড়ার সুযোগ বা সম্মতি দিলেও চাকুরী করার ক্ষেত্রে তার সম্মতি ছিল না। সংসারের শান্তি বজায় রাখতে আমিও তেমন জোর করার সাহস দেখাইনি। একটা সময় আমি আমার আইডেনটিটি ক্রাইসিসে ভুগতে থাকি এবং খুব অসহায় বোধ করি। এর থেকে পরিত্রাণ পেতে এবং নিজের একটা অবস্থান তৈরি করতে একটু একটু করে লেখালেখি শুরু করি ২০১৫ সাল থেকে। এরই মধ্যে আমার একক একটি কবিতার বই ও বেশ কয়েকটি যৌথ কবিতার বই প্রকাশের সাথে সাথে দেশে এবং দেশের বাইরে কলকাতা থেকে আমার লেখা প্রকাশিত হয়েছে কয়েকটি। তাছাড়াও কয়েকটা দৈনিক পত্রিকায় ও অনেক ম্যাগাজিনে আমার লেখা কবিতা ও ছোটগল্প নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে। এবং আমার লেখা কবিতা গানে রূপান্তরিত করে আমেরিকা  থেকে এবার গানের এ্যালবাম বের হয়েছে যাতে কণ্ঠ দিয়েছেন ভারতীয় দুজন স্বনামধন্য গায়ক-গায়িকা। আমি আমার আত্মপরিচয় কিছুটা হলেও করতে পেরেছি এই লেখালেখির মাধ্যমে।

আমি বিশ্বাস করি মানুষের ঐকান্তিক চেষ্টা, অধ্যবসায় ও স্বপ্ন পূরণের জন্য দৃঢ় মনোবল খুব প্রয়োজন।

একটি রিপ্লাই দিন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.