কম-ওজনের নবজাতকদের সমস্যা বা জটিলতা

0
942
শিশু

কম-ওজনের নবজাতকদের নানা ধরনের জটিলতার মধ্যে যেগুলো অপেক্ষাকৃত বেশিমাত্রায় পরিলক্ষিত হয় ও অধিকতর তীব্র সমস্যার সৃষ্টি করে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে:

 শরীরের তাপ-মাত্রা কমে যাওয়া
 রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা কমে-যাওয়া
 সংক্রমণ

শরীরের তাপমাত্রা কমে-যাওয়া

একটি নবজাতক শিশু স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার জন্য তার শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা বজায় থাকা জরুরি। নবজাতকের স্বাভাবিক তাপমাএা ৯৭.৫ থেকে ৯৯ ডিগ্রী ফারেনহাইট। কম-ওজনের শিশুদের চামড়ার নিচে চর্বির আবরণ অত্যন্ত হালকা থাকে বলে তাদের তাপের নির্গমন স্বাভাবিক শিশুদের তুলনায় বেশি হয়।এদের খাদ্য গ্রহণের ক্ষমতাও তুলনামূলকভাবে কম থাকে। ফলে, শরীরের উৎপাদন কম হয়। অধিকন্তু স্বাভাবিক শিশুর তুলনায় নড়াচড়া কম করার কারণেও এদের শরীরে তাপের উৎপাদন কম হয়। এসব কারণে এদের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে কমে-যাওয়ার একটা প্রবণতা লক্ষ করা যায়।

করণীয়

কম-ওজনের শিশুকে উষ্ণ পরিবেশে রাখা জরুরি। শিশুকে যে ঘরে রাখা হয় সেখানে, বিশেষ করে শীতকালে,হিটার দিয়ে গরম রাখলে তা শিশুর জন্য উপকারী হয়। তাছাড়া, পুরো শরীর ঢেকে রাখে ত্রমন সূতি-কাপড়ের পোষাক ও হাতে-পায়ে মোজা পরিয়ে রাখতে হবে। লক্ষণীয় যে, শিশুদের মাথার আয়তন শরীরের অন্য অংশের তুলনায় বেশি। এজন্য তার মাথা কাপড়ে ঢেকে রাখা জরুরি। তবে, মনে রাখতে হবে: অতিরিক্ত কাপড়-চোপড়ে শিশুর শ্বাস-প্রশ্বাসে যেন কোনো কষ্ট না হয় বা শিশু যেন ঘেমে না যায়।

রক্তে গ্লুকোজ কমে-যাওয়া

এমনিতেই নবজাতক শিশুর লিভার তুলনামূলকভাবে অপরিপক্ক থাকে। কম ওজনের শিশুর লিভার আরো বেশি অপরিপক্ক। অধিকন্তু, এরা পর্যাপ্তভাবে বুকের দুধ খেতে পাওে না। ফলে, এদেও রক্তে গ্লুকোজ কমে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে-যা শিশুর জন্য মারাতœক পরিণতি বয়ে আনতে পারে।

করণীয়

রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা পরিমিত রাখার জন্য বারবার বুকের দুধ খেতে দিতে হবে। মনে রাখতে হবে: কম ওজনের শিশু ত্রকবারে বেশি পরিমানে অথবা বেশিক্ষণ ধরে দুধ খেতে পারে না। এজন্যই এদেরকে বারবার দুধ খাওয়াতে হবে। অনেক মা অবশ্য তার ভ্রান্ত ধারণা থেকেই ভেবে বসে থাকেন তার শিশু পর্যাপ্ত দুধ পাচ্ছে না। লক্ষণীয় যে, শিশুর ওজন যদি সন্তোষজনক হারে বাড়তে থাকে এবং শিশু যদি পর্যাপ্ত প্রস্রাব করে তবে বুঝতে হবে সম্ভবত বুকের দুধের পরিমাণগত কোনো সমস্যা নেই।

নবজাতকের সংক্রমণ বা সেপসিস

নবজাতকের সংক্রমণ বা সেপসিস একটি মারাতœক রোগ এবং আমাদের দেশে নবজাতকের মৃত্যুর একটি প্রধান কারণ। জন্মের পর প্রথম মাসটিতে অন্য যেকোন বয়সের তুলনায় সংক্রমনের আশংস্কা বেশি থাকে। তবে কম-ওজনের শিশুর শরীরে রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা স্বাভাবিক শিশুর তুলনায় কম থাকে বলে এদের মধ্যে সংক্রমনের আশংস্কাও বেশি থাকে। উল্লেখ্য যে, নবজাতকের সংক্রমণ বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই জটিল আকার ধারণ করার সম্ভাবনা থাকে।

সংক্রমণ বা সেপসিস আছে কি না তা বোঝার উপায়

নবজাতক শিশু কোনো জীবানু দ্বারা সংক্রামিত হলে সবার আগে যে-লক্ষণগুলো চোখে পড়ে তা হলো: শিশুর নড়াচড়া কমে যায়, ঘুম ঘুম ভাব বেড়ে যায় এবং বুকের দুধ খাওয়া অস্বাভাবিক হারে কমে যায়। এছাড়া, জ্বর-আসা অথবা তাপমাত্রা কমে যাওয়া, ঘন ঘন বমি হওয়া, পেট ফুলে যাওয়া, শ্বাসকষ্ট, খিঁচুনি, রক্তক্ষরণ, ইত্যাদি লক্ষণও দেখা দিতে পারে।

করণীয়

কোনো শিশু যেন সেপসিস রোগে আক্রান্ত হতে না পারে সেজন্য সতর্ক থাকাটাই বেশি জরুরি। শিশুকে কোলে নেওয়ার আগে প্রতিবার হাত ধোয়ার অভ্যাস করতে হবে। সবসময় পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন কাপড়চোপড় পরিয়ে রাখতে হবে এবং পরিস্কার বিছানায় শোয়াতে হবে। শিশুর পরিচর্যাকারী লোকের সংখ্যা যথাসম্ভব কম হওয়া উচিত। যে ঘরে শিশুকে রাখা হয় সেখানে মা ও শিশুর পরিচর্যাকারী ছাড়া অন্যদের অবাধ আসা যাওয়া কম হওয়াই বাঞ্চনীয়। শিশুকে জন্মের পর থেকে ৬ মাস পর্যন্ত কেবলমাত্র বুকের দুধ খাওয়ানো শিশুর সুসাস্থ্য রক্ষা এবং সেপসিস প্রতিরোধেও অত্যন্ত জরুরি।

সেপসিস এর কোনো প্রাথমিক লক্ষণ দেখা দিলে অথবা ন্যূনতম সন্দেহ হলে দেরি না কওে শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরনাপন্ন হতে হবে অথবা জরুরি ভিওিতে নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। মনে রাখতে হবে: সেপসিস এর জন্য শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা করানোর প্রয়োজন হয়।
উপরোক্ত সমস্যাগুলো ছাড়াও কম ওজনের শিশুর আরও যেসব জটিলতা দেখা দিতে পাওে তার মধ্যে রয়েছে:

 শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা বা রেসপিরেটরি ডিসট্রেস সিনড্রোম।
 মস্তিষ্কে রক্রক্ষরণ
 জন্ডিস
 প্যাটেন্ট ডাকটাস আরটারিওসাস নামের একটি হৃদরোগ
 বৃহদান্ত্রের প্রদাহ

 

নবজাতককে কখন হাসপাতালে ভর্তি করবেন
 যদি ৩৪ সপ্তাহ গর্ভ পূর্ণ হওয়ার আগেই জন্ম নেয়
 যদি জন্ম ওজন ১,৮০০ গ্রামের কম হয়
 নবজাতক কোনো ধরনের অসুস্থতায় ভুগছে এমন বোঝা গেলে

 

নবজাতককের কম জন্ম-ওজন প্রতিরোধের কয়েকটি উপায়
 ১৮ বছরের কম বয়সের কোনো মেয়েকে বিয়ে না দেওয়া/গর্ভধারণ না কনা
 ঘন ঘন সন্তান ধারণ না করা (২ বছরের মধ্যে পুনরায় সন্তান না নেওয়)
 মায়ের রক্তশূন্যতা রোধ করা এবং খাদ্যের ঘাটতি পূরণ করা
 গর্ভাবস্থায় সঠিক পরিমাণে খাদ্য এবং পরিমিত বিশ্রামের ব্যবস্থা করা
 অবিবাহিত মহিলাদেও রুবেলা ভ্যাকসিন দেওয়া
 গর্ভাবস্থায় নিয়মিত চেক-আপ করানো

মনে রাখতে হবে: শিশুর ওজন যত কম, জটিলতায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা ততই বেশি। গর্ভ ৩৪ সপ্তাহ পূর্ণ হওয়ার আগে শিশুর জন্ম হলে অথবা জন্ম-ওজন ১,৮০০ গ্রামের কম হলে তার সমস্যা অন্য শিশুদের তুলনায় বেশি দেখা যায়। অথত্রব, তাদের বেলায় বাড়তি সাবধানতা অবলম্বন অত্যন্ত জরুরি।

ডাঃ শাহজাদা সেলিম
এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগ
বারডেম হাসপাতাল, শাহবাগ, ঢাকা
ফোন: ০১৯১৯০০০০২২, ০১৭৪৫৯৯৯৯৯০, ৯৬১৩৩৮৯-৯০

একটি রিপ্লাই দিন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.