ক্যাপ্টেন ওস্তাদ আজিজুল ইসলাম । বংশীবাদক হওয়াই ছিল যার স্বপ্ন-আলেয়া বেগম আলো

0
717
আজিজুল ইসলাম

শৈশব কৈশোর থেকে যে স্বপ্ন বুকে নিয়ে পথ চলা শুরু তা হল বাঁশি বাঁজানো। চিন্তায় চেতনায় অস্তিত্বে ধারণ করেছেন যিনি বাঁশি। বাঁশের একটি বাঁশি কত আপন হতে পারে তা ক্যাপ্টেন ওস্তাদ আজিজুল ইসলাম প্রমাণ করে দেখিয়েছেন। বাংলাদেশের জাতীয় এবং সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান একুশে পদক ২০১৭ পুরস্কার পেয়েছেন বাঁশিতে।

শুধু বাংলাদেশের নয়, গোটা উপমহাদেশেরই একজন প্রথম সারির ধ্রুপদী বংশীবাদক ওস্তাদ ক্যাপ্টেন (অব.) আজিজুল ইসলাম। তাঁর সাথে আমাদের কচিপাতার টিমের দীর্ঘ সময় আলাপচারিতা হয়। তার কিছুটা অংশ এখানে তুলে ধরলাম।

ক্যাপ্টেন ওস্তাদ আজিজুল ইসলাম

একদা সমুদ্রগামী জাহাজের নাবিক ক্যাপ্টেন আজিজুল ইসলাম আজ আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বংশীবাদক জীবনে বহু সাগর পাড়ি দিয়েছেন। নিভৃতচারী এ বংশীবাদকের জন্ম ১৯৪৫ সালে পিতার কর্মস্থল রাজবাড়িতে। গ্রামের বাড়ি বিশ্বনন্দিত সুরসম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর স্মৃতিধন্য ব্রাক্ষণবাড়িয়া। শৈশবকাল থেকেই তিনি স্থায়ী চট্টগ্রামে। চট্টগ্রাম মুসলিম হাই স্কুল থেকে মেট্টিক ও চট্টগ্রাম কলেজ থেকে আইএসসি পাস করে মেরিন একাডেমির প্রথম ব্যাচে যোগদানের মাধ্যমে সামুদ্রিক জীবনে তার প্রবেশ।

প্রায় অর্ধশতক শাস্ত্রীয় সঙ্গীত সাধনায় মগ্ন শিল্পীর হাতেখড়ি চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী আর্য সংগীত সমিতির শিক্ষক প্রিয়দা রঞ্জন সেনগুপ্তের কাছে। তারপর শিষ্যত্ব নিলেন শিল্পী ওস্তাদ বেলায়েত আলী খানের। স্বাধীনতা পরবর্তীকালে শিষ্যত্ব নিলেন বিশ্ববিখ্যাত সরোদবাদক ওস্তাদ বাহাদুর খানের। পরবর্তীতে তালিম নেয়ার সুযোগ পেলেন স্বর্গীয় পণ্ডিত পান্নালাল ঘোষের ঘনিষ্ঠ শিষ্য পণ্ডিত দেবেন্দ্র মুদ্রেশ্বর ও পণ্ডিত ভি জি কার্নাডের কাছে।

ভাষাসৈনিক কবি মাহাবুবুল আলম চৌধুরী বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর প্রধান মিলনায়তনে শিল্পীর বাঁশি শুনে ‘বাঁশির কান্না’  নামক কবিতা রচনা করেন। শিল্পীর বাঁশি শুনে আলেয়া চৌধুরী কবিতা লিখেন ‘অভিবাদন’, ‘মুরুলী আলাপ’ কবিতাটি লিখেন চৌধুরী মিফতাহ, ‘সমুদ্রের নীল মূর্ছনা’ কবিতাটি লিখেন অনিন্দিতা মুক্তা।

দেশের বরেণ্য সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, সংগীতজ্ঞ ও সাংবাদিক ওয়াহিদুল হক এবং বরেণ্য নাট্যব্যক্তিত্ব ও প্রাক্তন সচিব সাঈদ আহমদ শিল্পীর গুণ মুগ্ধ ছিলেন।

ক্যাপ্টেন ওস্তাদ আজিজুল ইসলাম

জাতীয় নাট্যশালায় বাঁশির এক অনুষ্ঠানে প্রধান বিচারপতি জাস্টিস ফজলুল করিম প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন যা একটি বিরল ঘটনা।

ওস্তাদ আজিজুল ইসলামের পিতা মরহুম রফিকুল ইসলাম এবং মাতা আজিজা খাতুন। শিল্পীর সহধর্মিনী ডা. আনজুমান আরা ইসলাম চট্টগ্রামের একজন সুপরিচিত শিশু বিশেষজ্ঞ। তাদের দুই কন্যা আমিনা ইসলাম ও দুর্দানা ইসলাম বর্তমানে কানাডায় বসবাসরত । তাদের দুইজনের প্রত্যেকের একটি পুত্র সন্তান ও একটি কন্যা সন্তান রয়েছে।

ক্যাপ্টেন ওস্তাদ আজিজুল ইসলাম

বিশ্ববিখ্যাত শাস্ত্রীয় সংগীত সম্মেলন ‘ডোভারলেন মিউজিক কনফারেন্স’-এর সুবর্ণ জয়ন্তীতে বাঁশি পরিবেশনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জন্য বয়ে আনেন বিরল সম্মান। সিঙ্গাপুরে ‘ইন্টারন্যাশনাল মিউজিক কনফারেন্স ফর ইন্ডিয়ান ক্ল্যাসিক্যাল মিউজিক এন্ড ড্যান্স’,  রামকৃষ্ণ মিশন ইনস্টিটিউট অব কালচার, দিল্লির হ্যাবিটেট সেন্টার, মুম্বাইয়ের নেহেরু সেন্টারসহ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাঁশি বাজিয়ে খ্যাতি লাভ করেন।”

ওস্তাদ ইসলাম প্রথমে স্থানীয় আর্য সঙ্গীত সমিতির প্রিয়দা রঞ্জন সেনগুপ্তর কাছে তালিম নেন। উপমহাদেশের প্রখ্যাত সরোদিয়া ওস্তাদ বাহাদুর হোসেন খাঁ-র কাছেও কিছুকাল তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে তালিম গ্রহণ করেন। তবে শাস্ত্রীয় বংশীবাদনের ক্ষেত্রে ওস্তাদ পান্নালাল ঘোষই ছিলেন তাঁর প্রথম ও প্রধান প্রেরণা। মূলত তাঁর বাজনা শুনেই তিনি ধ্রুপদী বংশীবাদনের প্রতি আকৃষ্ট হন। পরে উপমহাদেশের দুই দিকপাল বংশীবাদক দেবেন্দ্র মুর্দেশ্বর ও ভি.জি. কারনাড-এর কাছ থেকে দিকনির্দেশনা লাভ করলেও ওস্তাদ আজিজুল ইসলাম মূলত একজন স্বশিক্ষিত শিল্পী।

ওস্তাদ আজিজুল ইসলাম তাঁর পঞ্চাশ বছরেরও অধিক কালের বর্ণাঢ্য শিল্পীজীবনে দেশে বিদেশে বহু নামিদামি প্রতিষ্ঠানের আমন্ত্রণে বংশীবাদন পরিবেশন করেন। স্বদেশে ঢাকা ও চট্টগ্রাম শিল্পকলা একাডেমি, বাংলা একাডেমি, বাংলাদেশ জাতীয় যাদুঘর, জাতীয় প্রেসক্লাব, ছায়ানট ছাড়াও ভারতের কোলকাতা, দিল্লী, মুম্বাই, চেন্নাই, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে একাধিকবার সঙ্গীত পরিবেশনের বিরল সম্মান অর্জন করেন। তিনি তিন তিনবার সিটিসেল-চ্যানেল আই সঙ্গীত পুরস্কারে ভূষিত হন। ওস্তাদ আজিজুল ইসলাম উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতে সমর্পিত প্রাণ একজন আপাদমস্তক শিল্পী যিনি এখনও প্রতিদিন নিয়মিত রেওয়াজ করে থাকেন।

কচিপাতা: আপনার জন্ম শৈশব কৈশোর নিয়ে যদি কিছু বলতেন।

আ ই: শৈশব থকেই বাঁশির সুর আমাকে মুগ্ধ করত। আর তখন থেকেই নিজে নিজে বাঁশি বাজানোর চেষ্টা করতাম। তখন মেলার বাঁশি বাজাতাম। আর্য সঈীত সমিতিতে প্রিয়দা রঞ্জন সেগুপ্তের কাছে ১ম হাতেখড়ি নেই। বেতন দিয়েছিলাম মায়ের কাছ থেকে লুকিয়ে দশ টাকা এবং নিজের দুই টাকা দিয়ে। এরপর ওস্তাদ বেলায়েত আলী খানের কাছেই শিখেছি শাস্ত্রীয় সংগীত। পরে এই গুরু আমাকে কিছুদিনের জন্য তবলার তালিমও  দেন।

১৯৬১ সালে চট্টগ্রাম কলেজ থেকে আইএসসি পাস করে বাবার ইচ্ছায় মেরিন একাডেমির প্রথম ব্যাচে যোগ দেই। কিন্তু মন পড়ে থাকত বাঁশির কাছে। তখন মাসে মাত্র একদিন ছুটি পেতাম, যা বাঁশির রেওয়াজ করার জন্য যথেষ্ট ছিল না। ইতিমধ্যে মেরিন একাডেমির চিফ অফিসার ক্যাপ্টেন শাহ্ আমার বাঁশি বাজানোর কথা জানতে পারেন। তিনি মাসে তিনদিন ছুটির ব্যবস্থা করেন।

পেশাগত প্রয়োজনে দীর্ঘ সময় সাগরে থাকতে হয়। ফলে তালিম নেওয়ার সুযোগ থাকে না। জাহাজে নিয়মিত রেডিও শুনতাম। রেডিওতে বাঁশির সুর শুনে বাঁশির তাল ও সুরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে পরিচিত হতে চেষ্টা করতাম। অবসর সময়গুলো বাঁশি বাজিয়ে কাটাতাম। বিশ্বের অনেক  দেশে যেতে হতো। গুণী বংশীবাদকের গল্প শুনে শুনে আমার মনে হত “আমি যদি তাঁদের মত বাঁশি বাজাতে পারতাম। মুক্তিযুদ্ধের সময় করাচি ছিলাম। তিনবার চেষ্টা করে ১৯৭২ সালের সেপ্টেম্বরে দেশে পালিয়ে আসি। ১৯৭৩ সালে চট্টগ্রামের শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. আনজুমান আরাকে বিয়ে করি। আমাদের দুই মেয়ে। এরপর কিছুদিন বাংলাদেশ শিপিংয়ে ছিলাম। কিছুদিন সেইল করি। এরপর সামুদ্রিক জীবনের পরিসমাপ্তি টানি। তারপর ব্যবসা শুরু করি।

কচিপাতা: কিভাবে আপনি বংশীবাদক হয়ে উঠলেন?

আ ই: আমি সঙ্গীতের সঙ্গে জড়িত তো  ছেলেবেলা থেকেই। আমার ছোটবোন বেলা ইসলাম, ইস্পাহানি পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রিন্সিপাল ছিলেন, নামকরা উচ্চাঙ্গ সংগীতশিল্পী। ও ছোটবেলা থেকেই গান শিখত, আমি খুব আগ্রহভরে পাশে বসে শুনতাম। ওর হয়তো মনে নেই, আমার এখনও মনে আছে ‘ভলোবাসা মোরে ভিখারি করেছে’ এই গানটা দিয়েই ওর হাতেখড়ি হয়। তো শখটা ছেলেবেলা থেকেই ছিল। আর আমার নানা সেতার বাজাতেন। আমার মামাও গান-বাজনা করেন। নজরুল সঙ্গীত করেন উনি পারিবারিকভাবে আমাদের সংগীত চর্চা ছিল।

কচিপাতা: আপনি বাঁশি কেন পছন্দ করলেন?

আ ই: বাঁশি তো ছেলেবেলাতে প্রত্যেকেই পছন্দ করে। ছেলেবেলা থেকে খেলার ছলে মেলার বাঁশি-টাশি সাজিয়ে রাখতাম সুন্দর করে, শখে বাজাতাম। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার কোন তাগিদ ছিল না তখন। আমার মনে পড়ে,  রেডিওতে যখন গান চলত,  ভাটিয়ালি গান, আমার কানটা কিন্তু সব সময় বাঁশির সুরে মগ্ন হয়ে থাকত। আমাকে ভীষণভাবে নাড়া দিত সেটা। কি সুন্দর সুর!

ক্যাপ্টেন ওস্তাদ আজিজুল ইসলাম

কচিপাতা: আপনার পরিবারের সাথে সংস্কৃতির যোগাযোগটা কেমন ছিল?

আ ই: আমার নানার দিক থেকে আমার মা’র মধ্যে সাংস্কৃতিক ধারা প্রবাহিত। আমার বাবা ছিলেন স্পোর্টসম্যান। তিনি ফুটবল খেলোয়াড় ছিলেন। চাচা ছিলেন ক্যালকাটা মোহনবাগানের গোলকিপার। স্পোর্টসতো আসলে আর্টেরই একটা অংশ। আমার আম্মা সঙ্গীতের ব্যাপারে উৎসাহী ছিলেন, বাবাও খুব উৎসাহ দিতেন। আমার বোন পাবনায় কম্পিটিশনে ফার্স্ট হয়েছিল। আব্বাসউদ্দীন সাহেব গিয়েছিলেন প্রাইজ দিতে।

কচিপাতা: তারপর?

আ ই: তখন স্বাভাবিকভাবেই একটা বাধা আসল। মেরিন একাডেমিতে যাবার একদমই ইচ্ছে ছিল না আমার। আমি ঢাকা আহসাউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে চান্স পেয়েছিলাম। ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তি হলে, ঢাকায় থাকলে আমার বাজনারও সুবিধা হবে ভেবেছিলাম। মেরিন একাডেমিতে গেলে বাধা পড়বে, সমুদ্রে চলে যাব। কিন্তু আমি বাবা-মার কথা মত মেরিন একাডেমিতে ভর্তি হলাম। মাসে মাত্র একদিন শোর লিভ (Shore leave)  দেয়। প্রথম যাওয়ার পরদিনই ‘হবি পিরিয়ডে’ আমি যখন বাঁশি বাজাচ্ছি তখন ক্যাপ্টেন নজর  হোসেন শাহ্ খুব খুশি হয়ে বললেন, ‘আই অ্যাম ভেরি হ্যাপি।’ পরের মাসে তিনি আমাকে একদিনের পরিবর্তে তিনদিন ছুটির ব্যবস্থা করে দিলেন। আমার মনে হয় আজ পর্যন্ত একাডেমিতে এ-সুযোগ কেউ পায় নি। সুযোগটাকে আমি সিরিয়াসলি কাজে লাগালাম। একাডেমির বাসে করে রেলস্টেশন এ নামতাম। সেখান থেকে সোজা ওস্তাদজির বাসায় যেতাম। আলমাস সিনেমা হলের কাছাকাছি ওনার বাসা ছিল। সেখান থেকে ওনাকে পিক-আপ করে আমার বাসায় এনে সারাদিন শিখে বিকেলে ওনাকে নামিয়ে দিয়ে একাডেমিতে চলে যেতাম। জাহাজে টেপ রেকর্ডারে শুনতাম। শুনেই তো শেখা। এখনও আমি শুনে শুনে বহু জিনিস পিক-আপ করি।

কচিপাতা: আপনার শিল্পী জীবনে আর কাদের প্রভাব বেশি বলে আপনি মনে করেন?

আ ই: পান্নালাল ঘোষ বাবুর বাঁশি আমি রোজই শুনতাম, যাকে নাকি বাঁশির জন্মদাতাই বলতে হয়। সাড়ে চার হাজার বছর আগের বাঁশিটাকে রিপ্লেস করেছিলেন উনি। খুব বেশিদিনের না, ৬০-৭০ বছর আগের কথা। ওনার রেকর্ডিংগুলো আমাকে হেল্প করেছে। অল ইন্ডিয়া রেডিওর ন্যাশনাল  প্রোগ্রামগুলো হত রাত্রি ১০টা থেকে সাড়ে ১১টা পর্যন্ত হত। ওটা আমি রেগুলার শুনতাম। ওখান থেকে অনেক বড় বড় আর্টিস্টদের কাজগুলো শুনতাম।

কচিপাতা: জনসমক্ষে বাজানোর শুরুটা যদি বলতেন।

আ ই: ধরতে গেলে আমার আনুষ্ঠানিক শিল্পীজীবনের শুরু আমাদের বাসায়, ঘরোয়া জলসায়। নিয়মিত বাজাতাম ‘বাংলাদেশ ক্ল্যাসিকালস’ নামের একটা গ্রুপে। পরে ঢাকায় ওয়াপদা অডিটোরিয়ামে ‘তবলা শিক্ষালয়’-এর একটা প্রোগ্রামে বাজিয়েছি। এটা বোধ হয় ঢাকায় আমার প্রথম প্রোগ্রাম। এরপর ‘শুদ্ধ সঙ্গীত প্রসার গোষ্ঠী’র প্রোগ্রাম করেছি। বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রে ওরা তখন অনুষ্ঠান করত। এভাবে একসময় নিয়মিত অনুষ্ঠান করা শুরুহল আমার। ঢাকায় প্রেসক্লাবে প্রোগ্রাম করলাম, চট্টগ্রামে একটা বড় কনফারেন্স হয়েছিল। ওটার উদ্যোক্তা ছিলাম আমি আর ডাক্তার কামাল এ খান সাহেব। প্রথম দিনের প্রথম আর্টিস্ট ছিলো নিলুফার ইয়াসমিন। আমিও বাজিয়েছিলাম প্রথম দিন। ওস্তাদ বাহাদুর খাঁ সাহেবের ছেলে বিদ্যুৎ খাঁও কলকাতা থেকে এসেছিল,  সেও বাজিয়েছিল। কলকাতা সঙ্গীত রিসার্চ একাডেমিতে একক অনুষ্ঠান করি ’৮১ সালে। সাবির খাঁ সাহেব এসেছিলেন চট্টগ্রামে একবার। ১৯৯৬ সালে পবিত্র হজ পালন করি। এরপর ১৯৯৮সালে সালে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে একটা বড় অনুষ্ঠান করেছিলাম ওনাদেরকে নিয়ে । হাউজফুল অডিয়েন্স ছিল। খুব ভালো প্রেগ্রাম হয়েছিল, রোটারি ক্লাবের আয়োজনে। আমি রোটারি ক্লাব অব ইসলামাবাদের প্রেসিডেন্টও ছিলাম ১৯৯২ সালে। আমি রোটারির কাছেও ঋণী। সাবির খাঁর থ্রুতে পণ্ডিত ভি জি যোগের সাথে প্রোগ্রাম করেছি কলামন্দিরে। পরে উনি ঢাকায় এসে  প্রোগ্রাম করেছিলেন আমার সঙ্গে। আমি, উনি আর সাবির খাঁ। দেশের বাইরে আমি অস্ট্রেলিয়াতে ‘পোর্ট ফেইরি স্প্রিং  ফেস্টিভ্যাল’ এ গিয়েছি আমন্ত্রিত হয়ে। শুধু বাংলাদেশ না, পুরো ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট থেকে আমিই প্রথম আর্টিস্ট ওখানে। সাবির খাঁসহ অনুষ্ঠান করতে গিয়েছি সিডনি, ক্যানব্যারা। সিঙ্গাপুরে গিয়েছি দুই-তিনবার। ২০১৬ সালে ফেব্রুয়ারির ৩ তারিখে গিয়েছি সিঙ্গাপুরে। ওখানে শিবকুমার শর্মা, জাকির হোসেন খাঁ সাহেবদের মতো আর্টিস্ট ছিলেন।

কচিপাতা: সাধারণ মানুষের মধ্যে কি এটার প্রতি অনুরাগ তৈরি হচ্ছে?

আ ই: মূল ব্যাপারটা হল, এটা একটা কঠিন আর্ট। এই আর্টটা গভীর অভিনিবেশ দাবি করে। উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত তো মার্গ সঙ্গীত, মেডিটেটিভ সঙ্গীত। লিমিটেড শ্রোতার কাছেই এর কদর থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। চা খেতে খেতে আপনি এই আর্ট উপভোগ করতে পারবেন না। আপনাকে বসতে হবে একটা মেডিটেটিভ ওয়েতে। এই আর্টের সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য  শ্রোতার একটা স্পিরিচুয়াল লেভেল থাকা লাগে।

কচিপাতা:  নতুন প্রজন্মকে কীভাবে আকৃষ্ট করা যেতে পারে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের প্রতি।

আ ই: খুব দরকারি হচ্ছে, প্রোগ্রাম হওয়া, সেমিনার-সিম্পোজিয়াম হওয়া। ক্লাসিক্যাল আর্টটাতো সাধারণ শ্রোতার জন্য না। এটার জন্য একটা সফিসটিকেটেড এজুকেটেড গ্রুপ দরকার। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে।

কচিপাতা: আপনার নিজের কি কোন পরিকল্পনা আছে এই শিল্পটাকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানোর ব্যাপারে কিছু করার।

আ ই: আগে প্রচুর করতাম। বাংলাদেশ ক্লাসিক্যাল্স এ বহুদিন করেছি। আমার বাসায়ও আমি অনেক জলসা করেছি। অনেকেই আসত, শুধু শিল্পীরা নয়, অনেক ইয়াং ছেলেও আসত। রাত ১০টা ১২টা পর্যন্ত অনুষ্ঠান হত, খাওয়া দাওয়া হত।

কচিপাতা : কেউ যদি উদ্যোগ নেয় তবে আপনার ভূমিকা ?

আ ই: কেউ উদ্যোগ নিলে আমি অবশ্যই আমার সাধ্যমত চেষ্টা করব পরবর্তী প্রজন্মকে আমার জ্ঞান ও মেধাটুকু দিয়ে যেতে।

কচিপাতা: ভবিষ্যতে আমরা কচিপাতা থেকে কোন প্রোগ্রাম এর আয়োজন করলে আশা করি পাশে পাব আপনাকে।

আ ই: অবশ্যই আমি সর্বাত্মক চেষ্টা করব পাশে থাকতে।

কচিপাতা: আপনার নিজের একটা বাঁশি আছে সেটা সম্বন্ধে যদি বলতেন।

আ ই: এই বাঁশি আমার নিজের বানানো। বাঁশি বানাতে শ্রীমঙ্গলের বাঁশ ব্যবহার করেছিলাম। আমার রোটারিয়ান বন্ধু সেনগুপ্ত শ্রীমঙ্গল থেকে এক বান্ডিল বাঁশ পাঠিয়েছিলেন আমাকে। সেই বাঁশ থেকে বাছাই করে বাঁশিটি বানিয়েছিলাম।  আমার গুরু ভিজি কার্নাড বাবু কিছু টিুইনং করে দিয়েছিলেন বাঁশিতে। বাঁশিটি ৭ ছিদ্রবিশিষ্ট। এত বছর ধরে এই বাঁশি আমার প্রতি মুহূর্তের সঙ্গী। একবার দিল্লীতে এক ট্যাক্সিতে ভুল করে বাঁশি ফেলে এসছিলাম। হোটেলে গিয়ে বাঁশি খুঁজে না পেয়ে আমার তো নাজেহাল অবস্থা! মনে হচ্ছিল এখনই দম বন্ধ হয়ে মারা যাব। আমার স্ত্রী সেজদায় পড়ে। পরদিন সকালে  হোটেল কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় বিমান বন্দর এলাকা থেকে ওই ট্যাক্সি খুঁজে পাই এবং বাঁশিও খুঁজে পেয়েছিলাম। ধন্যবাদ সৃষ্টিকর্তাকে। তিনিই আমার বাঁশিটিকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন।

কচিপাতা: জানতে পেরেছি আপনার বাঁশিটি জাতীয় জাদুঘরে উপহার দেয়ার ইচ্ছা আছে।

আ.ই. : জাতীয় জাদুঘরে এক অনুষ্ঠানে  আমি বলেছিলাম বাঁশিটি যেন জাদুঘরে স্থান পায়। ওই অনুষ্ঠানে আমি বাঁশিটি বানানো, হারিয়ে যাওয়া ও খুুঁজে পাওয়ার ঘটনাটি শ্রোতাদের সাথে শেয়ার করেছিলাম। আমার মৃত্যুর পর বা  অনুপস্থিতিতে জাতীয় জাদুঘরের জন্য আমার বাঁশিকে উপহার দেয়ার ঘোষণা দিয়েছিলাম। ভালো লাগার বিষয় হচ্ছে, এই জাদুঘরের হলরুমে অসংখ্য বার বাঁশি বাজানোর সুযোগ হয়েছে। 

কচিপাতা : একুশে পদক পাবার অনুভুতি সম্পর্কে জানতে চাই।

আ.ই : যেকোনো সম্মাননাই আনন্দের।

প্রথমেই আমার মায়ের কথা মনে পড়েছে। মায়ের জন্যই আজ আমি ওস্তাদ আজিজুল ইসলাম। আমার মা এখনো জীবিত। এ কারণে আমাকে কিছুটা সৌভাগ্যবান বলতে পারেন। মায়ের জীবদ্দশায় এই অর্জন আমার কাছে পরম পাওয়া। আর অনেক ক্ষেত্রেই মরণোত্তর সম্মাননা দেয়া হয়। কিন্তু আমি আমার জীবদ্দশায় এই পুরস্কার  পেলাম, অবশ্যই এটা অনেক বেশি আনন্দের।

কচিপাতা : নতুন বাঁশি বাজাচ্ছেন যারা, তাদের নিয়ে কিছু বলুন।

আ.ই. : বাংলাদেশে সংগীত সাধকের তুলনায় বংশীবাদক কম। আর জীবিকার তাগিদ থাকলে বাঁশি বাজানোর শখটাকে ধরে রাখা ভীষণ কঠিন। এখন পেশা হিসেবে বংশীবাদকের অর্থনৈতিকভাবে স্বচ্ছল হওয়ার সুযোগ কম। তাই এখনকার ছেলেরা বাঁশি বাজাতে সেভাবে উৎসাহী হয় না। তবে বাঁশি বাজানো আজীবন সাধনার বিষয়।

কচিপাতা: পদকপ্রাপ্তি তো দায়িত্বও বাড়িয়ে  দেয়।

আ.ই. : শুধু দায়িত্ব বাড়ায় না অনেকটা ভারিও করে। আগের থেকে চ্যালেঞ্জটা আরো বেড়ে গেল। আরো ভালো কিছু উপহার দেওয়ার চেষ্টা থাকবে সব সময়।

কচিপাতা: বাংলাদেশের মানুষ বাঁশির সুর শুনতে মানুষকে এতটা আগ্রহী দেখা যায় না কারণ কি।

আ.ই. : তার জন্য কিছুটা সময় লাগবে। শাস্ত্রীয় সংগীতের চর্চা, পৃষ্ঠপোষকতা বাংলাদেশে তেমনটা হয় না। এখন কিছুটা পৃষ্ঠপোষকতা শুরু হয়েছে। শ্রোতা  তৈরি হচ্ছে দিন দিন। আর শাস্ত্রীয় সংগীত গণমানুষের জন্য না।

কচিপাতা: শিশু-কিশোর বা অভিভাবকদের জন্য কিছু বলেন।

আ.ই. : আমার মতে শিশু-কিশোরদেরে যে  কোন সৃজনশীল কাজে যুক্ত থাকা উচিত। সেটা লেখালেখি হতে পারে, ছবি আঁকা হতে পারে, গান হতে পারে। পড়ালেখার পাশাপাশি যে কোন সৃজনশীল কাজে যুক্ত থাকলে সে সহজে কোন ভুল পথে যেতে পারবে না।

কচিপাতা : আপনাকে অনেক ধন্যবাদ সময় দেওয়ার জন্য।

আ.ই. : আপনাদেরকেও ধন্যবাদ। কচিপতার জন্য অনেক অনেক শুভকামনা রইল, শিশু -কিশোরদের জন্য এমন উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসনীয়।

ক্যাপ্টেন ওস্তাদ আজিজুল ইসলামের জীবনের একটি স্মরণীয় ঘটনা

লাকোনিয়া জাহাজে আগুন এবং উদ্ধার কার্যক্রম

২২ ডিসেম্বর ১৯৬৩ সাল। গ্রীক বিনোদনতরী টিএসএমএস লাকোনিয়াতে আগুন লেগে ডুবে গিয়েছিল উত্তর মেডিরায়। হারিয়েছিল ১২৮টি জীবন। জাহাজটি তৈরি হয়েছিল নেদারল্যান্ডে। নাম ছিল এম.এস জোহান ভ্যান ওল্ডেনবার্নভেল্ট এবং এটা নিয়মিত ভ্রমণ করতো আমস্ট্রাডাম আর ইস্ট ইন্ডিয়ার মধ্যে। এই জাহাজটি আবার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সমরতরী হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছিল। পরে এটা ১৯৬২ সালে গ্রীসের জেনারেল ইস্টিম নেভিগেশন কোম্পানির কাছে বিক্রি করে দেয়া হয়।নামকরণ হয় লাকোনিয়া। জাহাজটি ১৯৬৩ সালের এপ্রিলে সাউদাম্পটন থেকে ক্যানারী আইল্যান্ড পর্যন্ত এক সফল বিনোদনতরী হিসেবে যাত্রা শুরু করে। প্রথমবারের মত দীর্ঘ যাত্রার এটা ছিল প্রথম পর্যায়। ১৯ ডিসেম্বরের যাত্রায় ৬৪৬জন যাত্রী এবং ৩৭৬জন নাবিক নিয়ে এই তরী ১১ দিনের এক ক্রিসমাস বিনোদন ভ্রমণে বের হয়েছিল। ক্যাপ্টেন ছিলেন ম্যাথিউস জার্বিস। যাত্রার চতুর্থ দিন সন্ধ্যায় একজন স্টুয়ার্ড দেখলো যে, জাহাজের সেলুনে আগুন লেগেছে। সেলুন দপ্দপ্ করে জ্বলছে। আগুনের লেলিহান শিখা প্যাসেঞ্জার কেবিনগুলোর দিকে ছড়িয়ে পড়ছে। জাহাজের বিপদ সংকেত বাজছে ভীষণ মৃদুলয়ে, যা অনেকেরই শুনতে পাবার কথা নয়।

ক্যাপ্টেন ওস্তাদ আজিজুল ইসলাম

লোকজন সরিয়ে ফেলার কাজটা কঠিন হয়ে পড়েছিল লাইফ বোটগুলোর এলোমেলো অবস্থার জন্য। তার উপর আবার কিছু লাইফবোট আগুনে পুড়ে গিয়েছে। কিছু যাত্রী অবশ্য সমুদ্রে নামতে পেরেছিল গ্যাং ওয়ে দিয়ে আর কিছু দড়ির মই বেয়ে। কাছাকাছি কয়েকটি জাহাজ বিপদ সংকেত পেয়ে এগিয়ে এসেছিল বলে অনেক মানুষের জীবন বেঁচেছিল।

পরে একটি অনুসন্ধান গ্রুপ বের করেছিল, আগুনটা লেগেছিল ভুল ইলেকট্রিক্যাল সংযোগের জন্য। তবে তারা তীব্র সমালোচনা করেছিল, যন্ত্রপাতির অযত্নের, নিয়মিত সতর্কতামূলক ড্রিল না করার এবং জাহাজের তদারকি ছিল নিম্মমানের।

এই জাহাজটিতে আগুন লাগার সময় ওস্তাদ আজিজুল ইসলাম যেই জাহাজে ক্যাডেট হিসেবে যোগ দেন সেই জাহাজটির নাম  ছিল এস.এস. মেহেদি। সেটি কাছাকাছি ছিল এবং রেডিওতে বিপদ সংকেত আসে SOS (save our soul)। ওনাদের জাহাজ দ্রুত উদ্ধার কাজে এগিয়ে যায়। ফলে তারা ২২টি জীবন রক্ষা করতে পেরেছিল। এর মাঝে ৪জনকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করে। এর আগে অন্যান্য জাহাজ এসে অধিকাংশ উদ্ধার কার্জ সমাধান করে। 

এই উদ্ধারকাজটি ওস্তাদ আজিজুল ইসলামের জীবনের অন্যতম একটি স্মরণীয় ঘটনা।

উল্লেখ্য ওই জাহাজে (s.s mehedi) একমাত্র বাঙালি এবং সর্বকনিষ্ঠ অফিসার ছিলেন ওস্তাদ আজিজুল ইসলাম। জাহাজের ক্যাপ্টেন ছিলেন AWF Willson । জাহাজটি করাচি থেকে আমেরিকা যাচ্ছিল still billet লোড করার জন্য। তখন তারা সংকেতটি পেয়ে উদ্ধারকাজের জন্য এগিয়ে যায়।

-এই প্রতিবেদনটি সম্পাদনা করেছেন ইঞ্জিনিয়ার শাফকাৎ আলম

একটি রিপ্লাই দিন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.