শিশুর জন্ম নিবন্ধন সম্পর্কীত আইন

0
654
Newborn

শিশুরাই জাতির ভবিষ্যৎ। একটি শিশু সুন্দর ভাবে গড়ে ওঠার এবং সুষ্ঠু বিকাশের প্রয়োজনে আমাদের অনেক করণীয় রয়েছে। জাতিসংঘ ঘোষণা করেছে শিশু অধিকার সনদ। এই শিশু অধিকার সনদে শিশুদের শিক্ষা, চিকিৎসা, নিরাপত্তা, জবরদস্তি শ্রম ও পতিতা বৃদ্ধি রোধ, যতেœর অধিকার সংরক্ষণের উপর বিভিন্ন বিষয়াবলীরও উল্লেখ রয়েছে। বাংলাদেশেও প্রচলিত শিশু সম্পর্কিত আইনের দ্বারা তার অধিকার রক্ষায় রাষ্ট্র বাধ্য।

আমাদের দেশে একটি শিশু নাগরিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায় সাধারণত

জন্মের পর জন্ম নিবন্ধনের মাধ্যমে। আসলে শিশুরা একটি সুন্দর সমাজ নির্মাণের উত্তরাধিকার। তাদের কিছু আশা কিছু স্বপ্ন থাকে। জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই একটি নাম নাগরিকত্ব এবং যতদূর সম্ভব পিতা-মাতার পরিচয় থাকতে হয়। অথচ জন্ম নিবন্ধন সম্পর্কে বাংলাদেশের মানুষের অজ্ঞতার কারণে এর কার্যকারিতা আশঙ্কাজনক হারে খুবই কম। আর এর ফলে তারা প্রথম অধিকার থেকেই বঞ্চিত। এক গবেষণায় দেখা গেছে বাংলাদেশের শিশুদের মধ্যে ৮৮% ভাগ জন্ম নিবন্ধন হচ্ছে না। ৭৪% ভাগ জনগণের জন্ম নিবন্ধন সম্পর্কে কোন ধারা নাই-নাই।

জন্ম নিবন্ধন না হওয়ার কারণ:

১৮৭৩ সালে প্রণীত জন্ম নিয়ন্ত্রণ আইন বহু পুরোনো। যারা নবজাতকদের জন্ম তথ্য সংগ্রহ এবং নিবন্ধনের জন্য রেজিস্ট্রারকে অবহিত করানোর দায়িত্ব প্রাপ্ত চৌকিদার গ্রাম্য পাহারাদার, দাই মোটেও সচেতন নয়। জন্ম তথ্যাদি জানানোর জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা রয়েছে-যার ফলে অভিভাবকদের মধ্যে গাফলতি দেখা যায় এবং বিলম্বের কারণে নির্দিষ্ট সময় চলে যাওয়াতে তার পরে কি হবে তার কোন উল্লেখ নাই। জন্ম গ্রহণকারী শিশুর বাবা-মা এবং ধাত্রীকে তথ্যাদি প্রদানের ক্ষেত্রে বাধ্যতামুলক দায়িত্ব দেয়া হয়েছে কিন্তু জন্ম নিবন্ধনের দেশে প্রচলিত আইনটিকে বাধ্যতামুলক করা হয়নি। সাধারণের মধ্যে প্রচারের উদ্যোগ নাই এবং বাংলাদেশের বাইরে বাংলাদেশী শিশুদের জন্ম নিবন্ধনের কোন ব্যবস্থা নাই। দেশে নিবন্ধন তথ্যাদি একত্রিকরণ ও সংরক্ষণ করার পদক্ষেপ গ্রহণের উল্লেখ নেই।

জন্ম নিবন্ধন না হওয়ার ফলাফলঃ

বাংলাদেশে জন্ম নিবন্ধন আইন বাস্তবায়ন না হওয়ার ফলে নানা ধরণের অসুবিধায় সৃষ্টি হচ্ছে। দেখা গেছে বিবাহ রোধের ক্ষেত্রে কিংবা শিশুশ্রম প্রতিরোধ আইন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে শিশু পতিতা সনাক্ত করণের আইন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কিংবা বাংলাদেশের বাইরে পাচারকৃত বাংলাদেশী নাগরিকদের সনাক্তকরণের ক্ষেত্রে জন্ম নিবন্ধন প্রয়োজন।

জন্ম নিবন্ধীকরণের প্রয়োজনীয়তাঃ

জন্ম নিবন্ধীকরণের মাধ্যমে একটি শিশু তার নাগরিকত্ব কিংবা মানবাধিকারের স্বীকৃতি অর্জন করে, তাছাড়া শিশুর মৌলিক অধিকার সংরক্ষণে সহায়তা করে। জন্ম নিবন্ধনের ধারা জনসংখ্যার পরিসংখ্যান নির্ণয় করা যায় এবং শিশুদের সঠিক বয়স নির্ধারণ করা যায় ফলে নির্দিষ্ট সময়ে স্কুল ছাত্র-ছাত্রীদের ভর্তি করানো যাবে। চাকুরীর বয়স সীমা সঠিকভাবে করা যাবে। ভোটাধিকার এর অধিকার সঠিক হবে। এফিডেফিট এর মাধ্যমে ছেলে-মেয়ের বয়স বৃদ্ধি করে বাল্য বিবাহের প্রচলন তা প্রতিরোধ সহায়ক হবে। উত্তরাধিকার হিসেবে সম্পত্তি পাবার পথ সহজ হবে।

বাংলাদেশে জন্ম নিবন্ধন আইন:

১৮৭৩ সালে বৃটিশ ভারতে জন্ম মৃত্যু এবং বিবাহ নিবন্ধন আইন প্রণীত হয়। ১৯৫৯ সালে শিশুর জন্মের পর সংবাদ ইউনিয়ন কাউন্সিল সেক্রেটারীর কাছে পৌছানোর দায়িত্ব গ্রাম্য চৌকিদারকে দায়িত্বদেয়া হয়। ১৯৩২ সালে বেঙ্গল মিউনিসিপাল এ্যাক্ট এবং ১৯৬০ সালে মিউনিসিপাল অর্ডিন্যান্স অর্ডিন্যান্স এর আইন দ্বারা শহর এলাকায় শিশুর জন্ম সংবাদ পৌরসভার রেজিস্ট্রারকে পৌছানোর দায়িত্ব পরিবারের সদস্য, হসপিটাল এবং ক্লিনিকগুলো। ১৯৭০ সালে সংশোধনের মাধ্যমে পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ এবং ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডকে নিজ নিজ এলাকায় জন্ম নিবন্ধনের দায়িত্ব দেয়া হয়। ১৯৮৩ সালে স্থানীয় সরকার ইউনিযন, পৌরসভা অর্ডিন্যান্সে জন্ম, মৃত্যু ইত্যাদি রেজিস্ট্রেশন গ্রাম্য পুলিশ, রেজিস্টর সংরক্ষণ করবে এবং ইউনিয়ন পরিষদকে জানাবে এবং চেয়ারম্যান রেজিস্টার হিসেবে কাজ করবে।

নিবন্ধনের পদ্ধতিঃ

পৌরসভা অধ্যাদেশ ১৯৭৭,১৯৯৭ সংশোধিত আইন এর ধারা ৬৭(১)(২) বলা হয়েছে। পৌর এলাকায় জন্ম, মৃত্যু, বিবাহ বিষয়ে রেজিস্টেশন ও প্রত্যায়ন পত্র পৌর কর্তৃপক্ষ করবেন। জন্ম নিবন্ধনে বেঙ্গল মিউনিসিপ্যাল এ্যাক্ট এর সেকশন ৪৪৮ (র), (রর) এবং (রা) নীতিমালা নিুরূপ- অর্থাৎ জন্মের ৭ (সাত) দিনের মধ্যে লিখিত ভাবে পৌর কর্তৃপক্ষকে অবগত করলে পৌরসভার রেজিস্ট্রার সরাসরি নাম-নিবন্ধন করা হয়। জন্মের ৯ (নয়) থেকে ৯০ (নব্বই) দিনের মধ্যে পৌর কর্তৃপক্ষকে অবগত করলে তদন্ত সাপেক্ষে রেজিস্ট্রারে নাম নিবন্ধন করা হয় এবং ৩(তিন) মাস পর কর্তৃপক্ষকে অবগত করলে জেলা প্রশাসকের অনুমতি সাপেক্ষে পৌরসভার রেজিস্টারে নামি নবন্ধন করা হয়।

জন্ম নিবন্ধন সম্পর্কে পিতা-মাতাদের যথেষ্ট সচেতনা বৃদ্ধি এবং নিশ্চিত করার উদ্বুদ্ধ করতে হবে। এ ব্যাপারে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা এবং সিটি কর্পোরেশন এর কর্মকর্তাদের উদ্বুদ্ধ এবং সংগঠিত করতে হবে। স্কুলে সর্ব প্রথম ভর্তির সময় নিবন্ধন সনদ প্রদর্শন বাধ্যতামুলক করতে হবে। জন্ম বিষয়ক তথ্য পাওয়ার জন্য সরকারী/এনজিও, স্বাস্থ্যকর্মী পরিবার পরিকল্পনা মাঠ কর্মীদের সহায়তা নিতে হবে। শিশুর জন্ম নিবন্ধনের পর। ইউনিয়ন পৌরসভা ও পৌরকর্পোরেশনকে জন্ম নিবন্ধনকৃত শিশুকে বিশেষ পুরস্কার প্রদানের মাধ্যমে কিংবা বাৎসারিক সভায় মা ও শিশুর সম্বর্ধনা প্রদানের মাধ্যমে উৎসাহ প্রদান করতে হয়।
বাংলাদেশের জন্ম নিবন্ধন আইনটি কার্যকরণে এবং সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষে বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবি সমিতি ১৯৯৮ সাল থেকে এক বলিষ্ট ভূমিকা রাখছেন এবং এ আইন সংশোধণ ও পরিবর্তনের জন্য সুপারিশ আকারে প্রণয়নের লক্ষে সমিতি কাজ করে যাচ্ছে।

ডাঃ শাহজাদা সেলিম
এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগ
বারডেম হাসপাতাল, ঢাকা।
ফোন: ০১৯১৯ ০০০০২২, ০১৭৪৫ ৯৯৯৯৯০, ০২-৯৬১৩৩৮৯-৯০

একটি রিপ্লাই দিন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.