সানি বনি এবং নাকানি : রুহুল আমিন বাচ্চু

0
632

 

 

আরে বাবা সারাদিন কি দেখছিস? মায়ের নিত্যকার ধমকানি অরিনের আর ভাল লাগে না। সাড়ে ছ’ঘন্টা স্কুল শেষ করে বাসায় ফিরলো চব্বিশ মিনিট হয়নি, এরি মধ্যে সারাদিনের খোঁটা।

-আয়নাটা ও ঘর থেকে না সরালেই নয়!

রান্নাঘরের দিকে মাকে যেতে দেখে আয়নায় আবার চোখ ফেলে, নিজের নাকটা একটু টিপে-টুপে তারপর ড্রেস চেঞ্জ করে অরিন। আব্বুকে বহু অনুরোধ করে বেডরুমে আয়নাটা লাগিয়েছে, আর এটা মার মোটেও সহ্য হয় না। পাটোয়ারীর বেটী! মাকে একটু শাসন করতে ইচ্ছে করে।

তার দেহের সবটুকু অতি যতœ করে নিখুঁত গড়ে দিয়েছেন সৃষ্টিকর্তা, শুধু নাকটা ‘এট্টুসখানি! আয়নায় নাক ফুলিয়ে গোস্বার বুদ্বুদ ওঠে। এক সময় ভাবে যাদের একদম নাকই নেই। গোস্বার ফনাটা তখন মিইয়ে যায়।

নাকটাকে এমন জায়গায় সৃষ্টিকর্তা ফিট করে দিয়েছেন যে একে আড়াল করার কোন ব্যবস্থা নেই। যেমন দাঁত বাঁকা হলে জনগণের মেলায় না হাসলেই হয়, আবার ঠোঁট নামক সুন্দর একটা ঢাকটিনও রয়েছে দাঁতের ওপর। আর নাক চেপেও রাখা যায় না, আড়ালও করা যায় না। এরপর দম প্রবাহ মানে জীবনটা সেই নাকের সুরঙ্গ পথেই আসা-যাওয়া করে। এ নাক নিয়েই যত্তোসব ন্যাকামো।

ওর মা-বাবার দুজনের নাকই অভিজাত শ্রেণীর, মানে টিকালো। বলা যায় বাঁশির মতো। কবি সুন্দর নাককে বাঁশির সঙ্গে তুলনা করেছেন। নাক দিয়ে বাঁশির মতো কোন সুর বের না হলেও নাকি সুর একটা রয়েছে। তাতেই হয়তো কবি বাঁশির সুর বেধেঁছেন। মানুষের মুখমন্ডলের মোট সৌন্দর্যের আটষট্টি শতাংশ নাকের ডগায় গঠনের ওপর নির্ভরশীল। এটারও বিশেষত্বের কোন কারণ থাকতে পারে। যেথায় সুন্দর সেথায় সুর। নিকটাত্মীয়রা বলে মা-বাবার দুজনের সমন্বিত নাক অরিনের। একমাত্র কন্যার নাকের মোটাতত্ত্বের কারণে মা-বাবা দুজনেই চিন্তিত। ছোটবেলায় অরিনের নানি ওর নাক টিপে টিপে চাইতেন চোখা করার জন্য, আর ও নাক ফুলিয়ে ফুলিয়ে বের করতেন যতসব শ্বেত আঁঠাল পদার্থ। তাতেই নাকি রিএকশন হয়েছে।

অথচ, তারই ছোট দুই যমজ ভাই সানি-বনি, চোখা নাকের কৌলীন্যে আলাদা মর্যাদাবান। সানি পেয়েছে বাবার নাক আর বনি পেয়েছে মায়ের নাক। ওদের বাবার নাক দাদার মতো। দাদার বাবার নাক কার মতো ছিল সে তথ্য নেই। কারণ বাবার জন্মের আগেই দাদার বাবার চিরবিদায় ঘটে। তবে শোনা যায় আরবি বংশের ঐতিহ্যবাহী চোখা নাকের ধারাবাহিকতা এ বংশের নাকে প্রকাশমান।

সানি-বনি দুজনেরই চেহারা, সাইজ, স্বাস্থ্য একই রকম। ওদের আব্বু আম্মু ওদের জন্য একই ড্রেস আনেন। পার্থক্য শুধু নাকে। নাক বিহনে ওদের আলাদা চেনার কোন উপায় নেই। ওদের ব্যাপারটা নাক দিয়েই শুধু চেনা যায়। ওদের একজনের দাঁতে ব্যাথা তো অন্যজনের পেট ব্যাথা। একজনের জ্বর তো অন্যজনের হ্যাঁচ্চো। পা্যঁচ লাগলো আইডিয়েল স্কুলে ভর্তি হতে গিয়ে।  সাক্ষাৎকার পর্বে সানি বেরিয়ে এলো তো বনির ডাক পড়লো বোর্ডে। বনি ঢুকলো তো একজন স্যার বলে উঠলেন, তুমি আবার এসছ কেন? ছোট হলেও চোখা নাকের বুদ্ধি ছিল তার মাথায়। স্যার আমি আসিনি, আগের জন আমার যমজ ভাই’। সাহস করে স্যারদের সামনে বলে ফেলে।

দুজনকেই আবার ডাকা হলো। একই চেহারা একই পোশাক, একই উচ্চতা, শেষতক নাক দিয়ে পার্থক্য বের করে ওদের ভর্তি করা হলো। সানি এন্ড বনি।

অমিলটা তাদের আরেক জায়গায়ও। একজনের মাছ পছন্দ তো অন্যজনের মাংস। একজনের আলু পছন্দ তো অন্যজনের কদু । খাবার নিয়ে ওদের তিরিক্ষি ভাব সামলাতে মাকে দু’চার ঘা মারতে হয়।

অরিন ক্লাস এইটে আর ওরা দুজন ফাইভে। ওদের আব্বু অরিনকে একটু স্পেশাল চোখে দেখাতে ওরা দুজনে জোঁটবাধে। একদিন কোথা থেকে বনি এক শব্দ আবিষ্কার করে ফেলে। শব্দটা হলো নাকানি। তাও নিজের নাক অরিনকে দেখিয়ে। অরিন যায় খেপে। অরিন আরো খেপে তো ওরা আরো জোরে বলে। শেষাবধি দাঁড়ালো, ওরা পড়ার জন্য যতোটা না মার খায়, নাকানি বলার জন্য তার চেয়ে বেশি।

অরিন শব্দটা হজম করতে না পেরে দিনে দিনে নাক-কাঁদুনে হয়ে যায়। শেষে সারা ঘরময় কেঁদে বেড়ানো তার অভ্যাস হয়ে দাঁড়ায়। তবে ওদের আব্বু যখন ঘরে থাকে ওরা তখন একশত ভাগ গুড বয়।

একদিন আব্বুর হাতের একাশি শিক্কা দুআনা ওজনের থাপ্পড় খেয়েছিল বনি, সানিরও তাতে জ্বর উঠেছিল।

পত্রিকা থেকে একটা নিউজ কাটিং করে রেখেছে অরিন। যত কষ্টই হোক প্লাস্টিক সার্জারি করে এ নাকাল থেকে মুক্তি চায় সে। মাইকেল জ্যাকসনের সার্জারির আগে ও পরের নাকের ছবি আব্বুর সামনে মেলে ধরে। সানিও একদিন আবিষ্কার করে তাদের নানির নাক রহস্য। এখন এতোটা বোঝা না গেলেও এককালে অরিনের মতই ছিল। মামার এ্যালবামে সাদাকালো ছবিটা ভাল করে দেখে নেয়। ছবিটার একটু আধটু ছাল-বাকল উঠলেও নাকটা একেবারে অক্ষত। নানি একদিন বেড়াতে এলে সানি নানির নাকের দিকে চেয়ে হেসে দেয়। রহস্যের ঘ্রাণটা অরিনের নাকে যেতে দেরি হয় না। এবার শুরু হয় ডাবল এ্যাকশন। সানি-বনির পিঠে চলে টিভির টেন স্পোর্টস চ্যানেলের রেসলিংয়ের মাইর। তখন মারগুলো হেসে হেসে হজম করলেও রাতে টের পায়।

একদিন চুপিসারে অরিন মা’র কাছে নানির নাকের কাহিনী জানতে চায়। মা বলে তোর বয়স বাড়লে দেখবি নাকটাই সুন্দর। খু-উ-ব সুন্দর।

‘তার মানে আরো মোটা! মার কথায় অভিমান হয় তার।

‘জানিস আমার বাবা পাটের ব্যবসা করতেন। আমার মা’র ইয়া লম্বা চুল আর সুন্দর নাক দেখে বাবা ছন্দ লিখেছিল। অবশ্য, আমার জন্মেরও আগে।

‘শোনাও তো দেখি, তোমার পাটের বেপারী বাপের ছন্দ’।

‘শোন,

পাটের মতো লম্বা চুল।

নাকে ঝুলে বনফুল।

খোঁপায় দিলাম জারুল ফুল।

তুমি আমার বুলবুল।

সানি-বনি তো হেসেই গড়াগড়ি।

-জারুল ফুল! অরিনের প্রশ্ন।

‘তোর নানা বাড়ির মসজিদওয়ালা ঘাটের ডানপাশের গাছটার নামই তো জারুল গাছ। যা সুন্দর! বেগুনি রঙের থোকা থোকা ফুল, দেখিসনি?

– কোথায় দেখলাম! সেই কবে নানা বাড়ি গেলাম। পরদিনই তো আব্বু চল-চল। লেখাপড়া সব শূণ্য, শূণ্য’।

– তোমরা আমাদের কিছুই দেখতে দাও না, এমনকি পুকুরের ঘাটেও যেতে দাওনি। বনির জেদ মায়ের ওপর’।

-‘আরে বাবা, তোরা তো সাঁতার জানিসসে’-

-পুকুরে না নামলে কি করে সাঁতার শিখবো? সবকিছুতেই তোমাদের যতোসব!

ওদের পাল্টাপাল্টি জেদ এখানেই থেমে যায়। কলিংবেলের শব্দে দরজা খুলে দেয় রোজিনা। ওদের আব্বু অফিস থেকে ফিরেই আম্মুকে বলে কাপড় পাল্টে নাও মার্কেটে যেতে হবে। শুক্রবার ওরা পিকনিক করবে আগের সিদ্ধান্ত। রান্নাবান্না ঘরে, খাবে ছাদে। রোজিনাকে নিয়ে আয়োজনে মেতে  উঠে ওরা। মা বলেই দিয়েছেন রান্নাঘরের দিকে আসবেন না। আব্বুর ঘরে ছাদে আয়োজন মাঝেমধ্যে এমন হয়। তবুও বোটানিক্যাল গার্ডেনে নেবেনা চিড়িয়াখানায় যেতে দেবে না। যদি খাঁচা থেকে বাঘ বেরিয়ে পড়ে! ভাল্লাগেনা, এসব ঠুনকো যুক্তি। বনির কথায় সমর্থন জানায় সানি।

রোজিনা টিন থেকে চাল বের করে। বাছাই করে অরিন। বনি কিছুক্ষণ নিরীক্ষণ করে একটা প্রশ্ন ছূঁড়ে দেয় অরিনের দিকে। বলতো আপু, আতপ চাল কী করে হয়? প্রশ্নটা শুনেই অরিন যেনো গর্তে পড়লো। যা ভাগ, বলে বনিকে তাড়ালেও একটি খোঁচা যেন মাথার তালুতে বিঁধে থাকলো।

এ প্রশ্নের একটা হেস্তনেস্ত না করলে ওতো আবার ফাঁসাবে। ঠিকই ঘুরে আসে বনি-

পারলে না?

-পারব কি? আতপ চাল, আতপ চাল। চালতো চালই। ধান কুটেই তো চাল, ওটাতো আর মেশিনে মোল্ডিং করে বানানো হয় না।

-ঠিক করে বল। মাস্টারের ভূমিকায় বনি। চেচিঁয়ে মাকে ডেকে এ যাত্রায় বনির হাত থেকে নি®কৃতি নেয়।

‘তাই তো, আতপ চাল কি করে হয়? শশী আন্টিকে জিজ্ঞেস করলেই জানা যাবে।’ চুপিচুপি পাশের বাসাতে চট করে চলে যায়। ইংরেজিতে অর্নাস পড়ে শশী আন্টি। উওরটা নিশ্চয় ডাল-ভাত। ভাতের কথা মনে হতেই আবার প্রশ্ন দাড়াঁয় সেদ্ধ চাল। আতপ-সেদ্ধ ভাবতে ভাবতে সিড়িঁ ভাঙে। কিন্তু শশী আন্টির জবাবটা মনে ধরে না। রঙ সাদা বলেই নাকি আতপ নাম। আবার বলে পোলাউর চাল, আবার বলে যে চাল পিষে আটা বানায়, এসব আরকি!

এবার অরিন গেল রীনা আন্টির বাসায়। কম্পিউটার সায়েন্সে পড়ে প্রাইভেট ভার্সিটিতে। লেখাপড়ায় খুব ভাল। দেখতে তাল পাতার সেপাইনী হলেও বুদ্ধি-জ্ঞান ভাল রাখে। সেপাইনী শব্দটা ভাবতেই হাসি পেল তার, ইচ্ছে করেই ‘নী’ প্রত্যয় যোগ করেছে। রীনা আন্টি আউশ, আমন, বোরো ইত্যাদি থেকে আমনকে বেছে নিয়ে বলেন, আমন ধান থেকেই আতপ হয়, বলে ওকে বিদেয় করে।

খাদে পড়ে নিজেকে উদ্ধারের চেষ্টা তার বিফল। ভেবেছিল, মাকে না জানিয়েই উওরটা পেয়ে যাবে। এবার হতাশ হয়ে ঘরে ফিরে আসে। শশী আর রীনা আন্টির কথাগুলো মা’র কানে কানে বলেই ফেলে। মা তো সেলাইয়ের কাজ ফেলে হাসতে হাসতে মেয়েকে জড়িয়ে ধরে।

পাশের রুম থেকে বেরিয়ে আসেন নানি। নানি অরিনকে দেখেই হাতে নাক আড়াল করে হাসির কারণ জানতে চান। অরিন গম্ভীর ভাবে নানির ঢাকা নাকের দিকে রাইট এঙ্গেলে তাকায়। নানি দ্রুত আঁচল-দিয়ে নাক ঢেকে দেয়। তাদের জটলায় বনি এগিয়ে যায়। এরি মধ্যে বাজার সদাই নিয়ে কেয়ারটেকার এখলাছ ঘরে ঢুকে। রান্নাঘরের ঢালায় ব্যাগ উপুড় করে মাছ ঢেলে দেয়। রনি এবার ফণা তুলে বনির দিকে তাকায়।

অরিন নাক-মুখ পাকিয়ে বলে, বল তো বনি এগুলো কী মাছ?

সানি-বনি দুজনেই সমঃস্বরে জবাব দেয়, রুই মাছ। অরিন বিজ্ঞজনের গাম্ভীর্য নিয়ে বলে, হলো না, এগুলো মৃগেল মাছ। নানি এবার অরিনের পান্ডিত্যকে কেড়ে নিয়ে বলেন, নাতনি তুমিও পারলে না, ও দুটো কাতলা মাছ। কাতলা মাছের মাথা বড়।

ফ্লোরটা এবার নানির পায়ের তলায়। বলেন খালি তো পিটিস পিটিস কম্পিউটার টিপিস। আকাশে উড়িস। জ্ঞানীর ভাব ধরিস। সপ্তাখানেক গ্রামের বাড়ি থাকলে কি হতো? গাছগাছালি, মাছ-পক্ষী কত কিছুই তো এখনও দেখলে না, চিনলেও না।

সুযোগ পেয়ে সানি-বনি অরিনের দিকে তাকিয়ে বলল, কেমন নাকানি খেলে?

অরিন ম্যা-ম্যা করে উঠতেই নানি পড়ে যাওয়া আঁচল নাকে তুলে বললেন, কাঁদিসনে বোন। রাতে ও দুটো ঘুমুলে নাক টিপে দেব বোন।

একটি রিপ্লাই দিন

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.